উপসাগরে গ্রিসের তৎপরতা: নিরাপত্তা অংশীদার নাকি ইসরায়েলের ‘ট্রোজান হর্স’?
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের শেষভাগ থেকে এথেন্সের কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও এই উদ্যোগকে অনেকেই জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের স্বাভাবিক কৌশল হিসেবে দেখছেন, তবে একাংশের বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিসের এই সক্রিয়তার দুটি প্রধান কারণ হলো ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা এবং তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে গ্রিস প্রথম ধাপে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে তুরস্ক-বিরোধী একটি আঞ্চলিক সমীকরণ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এ সময় ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০২১ সালে সৌদি আরবে গ্রিসের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
তবে ২০২১ সালের পর তুরস্কের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে সেই কৌশলগত পরিকল্পনা কার্যত গতি হারায়। এরপর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গ্রিস নতুন কৌশল গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব মোকাবিলা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে গ্রিসের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দেশটির প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচি ইসরায়েলি প্রযুক্তিনির্ভর। পাশাপাশি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রীক যুদ্ধবিমান পাইলটদের প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ এবং সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছে।
বিশ্লেষকদের দাবি, এই সম্পর্ক এখন সাধারণ প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের সীমা ছাড়িয়ে আরও গভীর কৌশলগত সমন্বয়ে পরিণত হয়েছে।
এদিকে গাজা যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে গ্রিস উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নিজেকে একটি বিকল্প নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে গ্রিসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিকোস ডেন্দিয়াস সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব সফর করেন। একই সময়ে আঞ্চলিক সংঘাত চলাকালে গ্রিসের সামরিক স্থাপনাগুলো বিভিন্ন রসদ পরিবহনে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হওয়ায় ইসরায়েল গ্রিসকে একটি পরোক্ষ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ধারণা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা ধীরে ধীরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
এছাড়া ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (আইমেক) প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্ক ও মিসরকে পাশ কাটিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের নতুন সংযোগ গড়ে তোলার প্রচেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য গ্রিসের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তির আগে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: মিডলইস্ট আই






